বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি আবারও বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল–এর মধ্যে সংঘাত এই প্রণালির নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে…
হরমুজ প্রণালি ঘিরে ট্রাম্পের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত?
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি আবারও বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল–এর মধ্যে সংঘাত এই প্রণালির নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—যদি ইরান এই প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়, তবে তেলের দাম দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি আন্তর্জাতিক নৌজোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার লক্ষ্য—হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং যেকোনো বাধা দূর করা। তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানান।
তবে বাস্তবতা তার প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। ইউরোপীয় মিত্রসহ অধিকাংশ দেশ এই উদ্যোগে সরাসরি অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এতে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন এবং প্রয়োজনে ইরানের উপকূলে ব্যাপক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি; বরং তারা এটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জাহাজের জন্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রণালিটির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল প্রশস্ত, যা এটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এমন অবস্থায় বড় আকারের নৌজোট পরিচালনা করা সহজ নয়।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বহুজাতিক নৌজোট গঠনের ক্ষেত্রে “ইন্টারঅপারেবিলিটি”—অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের বাহিনীর সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা—একটি বড় বাধা। যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৌশলগত সমন্বয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে ইরানের জন্য এই প্রণালি একটি কৌশলগত সুবিধা। কারণ এটি তাদের উপকূলের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে তারা সহজেই এখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং প্রয়োজনে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম।
বর্তমানে বেশ কয়েকটি দেশ সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ না নিয়ে কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে। ভারত, তুরস্কসহ কিছু দেশ ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি “খুলে দেওয়ার” পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। এটি শুধু সামরিক নয়, বরং কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক জটিলতার সঙ্গে জড়িত একটি ইস্যু। তাই নৌজোট গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমনটি মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

