দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে রয়েছে মঙ্গল গ্রহ। পৃথিবীর বাইরে মানুষের বসবাসের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গ্রহ হিসেবে বিবেচিত এই লাল গ্রহকে বাসযোগ্য করে তোলার নানা উপায় নিয়ে চলছে গবেষণা। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি এক যুগান্তকারী সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা—পৃথিবীতে বিদ্যমান মাত্র দুটি অণুজীব ব্যবহার করেই মঙ্গলের প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের জন্য নিরাপদ আবাস গড়ে তোলা সম্ভব হতে…
লাল গ্রহে মানুষের নতুন ঠিকানা: দুই অণুজীবেই বদলে যেতে পারে মঙ্গলের ভবিষ্যৎ
দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে রয়েছে মঙ্গল গ্রহ। পৃথিবীর বাইরে মানুষের বসবাসের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গ্রহ হিসেবে বিবেচিত এই লাল গ্রহকে বাসযোগ্য করে তোলার নানা উপায় নিয়ে চলছে গবেষণা। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি এক যুগান্তকারী সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা—পৃথিবীতে বিদ্যমান মাত্র দুটি অণুজীব ব্যবহার করেই মঙ্গলের প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের জন্য নিরাপদ আবাস গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
গবেষকদের মতে, মঙ্গলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর পাতলা বায়ুমণ্ডল, তীব্র মহাজাগতিক বিকিরণ এবং শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেনের অভাব। পাশাপাশি সেখানে নির্মাণসামগ্রী পৌঁছানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই সব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বিশেষ কিছু অণুজীব, যা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করেই কাঠামো নির্মাণ ও অক্সিজেন উৎপাদনে সহায়তা করবে।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘Frontiers in Microbiology’-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় মূলত দুটি অণুজীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রথমটি হলো Sporosarcina pasteurii। এটি ইউরিওলাইসিস নামক একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যালসিয়াম কার্বনেট তৈরি করতে সক্ষম। এই উপাদান মঙ্গলের আলগা ধূলিমাটিকে শক্ত কংক্রিটের মতো রূপ দিতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় মাটি ব্যবহার করে মজবুত দেয়াল, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় অণুজীবটি হলো Chroococcidiopsis, যা এক ধরনের সায়ানোব্যাকটেরিয়া। এই অণুজীবটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং মঙ্গলের মতো চরম তাপমাত্রা ও উচ্চ বিকিরণপূর্ণ পরিবেশেও বেঁচে থাকার সক্ষমতা রাখে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারে, যা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, এই দুই অণুজীবকে একসঙ্গে ব্যবহার করে ‘বায়োসিমেন্টেশন’ নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মঙ্গলের স্থানীয় মাটি দিয়ে শক্ত ও টেকসই স্থাপনা তৈরি করা সম্ভব। এটি মহাকাশ গবেষণায় একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারে। কারণ বর্তমানে পৃথিবী থেকে মাত্র এক কেজি নির্মাণসামগ্রী মঙ্গলে পাঠাতে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
এই পদ্ধতি সফল হলে পৃথিবী থেকে ভারী ইট, সিমেন্ট বা ধাতব কাঠামো পাঠানোর প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। ফলে ভবিষ্যতের মানব মঙ্গল মিশন আরও বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হবে। পাশাপাশি পুরু ও শক্ত দেয়াল মঙ্গলের ক্ষতিকর কসমিক রেডিয়েশন থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অণুজীবের সহায়তায় তৈরি এই প্রযুক্তি শুধু মঙ্গলে ঘরবাড়ি নির্মাণেই নয়, বরং সেখানে দীর্ঘমেয়াদি মানব জীবনধারণের ভিত্তি গড়ে দেবে। স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে নিরাপদ আবাস, অক্সিজেন উৎপাদন এবং পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে এই গবেষণা মানব সভ্যতার মহাকাশ অভিযাত্রায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি

