ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়া গণ-আন্দোলনের মুখোমুখি ইরান। দেশটির রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহরের রাস্তায় নেমে বিপুল সংখ্যক মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, তার পরবর্তী সময়ে এটি কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলন। এবারের আন্দোলনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে…
ইরানে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, বাড়ছে প্রাণহানি
ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়া গণ-আন্দোলনের মুখোমুখি ইরান। দেশটির রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহরের রাস্তায় নেমে বিপুল সংখ্যক মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, তার পরবর্তী সময়ে এটি কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলন।
এবারের আন্দোলনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দেশটির দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট। ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণেই সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং আগে থেকেই বিভিন্ন খাতে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তোলে। পুরো বছরজুড়েই অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়।
প্রথমে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার দ্রুত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। তবে ততক্ষণে আন্দোলন দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি ছোট শহরে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংস সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন পর্যন্ত ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরান ছাড়াও কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহান, উত্তরের বাবোল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দেজফুলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের ফলে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহের আন্দোলনে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন শিশু এবং আটজন নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া গ্রেফতার করা হয়েছে অন্তত দুই হাজার ২৭৭ জন বিক্ষোভকারীকে।
অন্যদিকে, নরওয়ে-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, নয়জন শিশুসহ কমপক্ষে ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে নিহতদের স্বজনদের কথা বলে অন্তত ২২ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এদের অনেকেই লোরেস্তান এবং কুর্দি-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইলাম ও কেরমানশাহ প্রদেশের বাসিন্দা।
বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালাতে দেখা গেছে। তেহরানের উত্তরাঞ্চল থেকে পাঠানো একটি ভিডিওতে সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীদের ‘ভয় পেও না, আমরা সবাই একসঙ্গে’ বলে স্লোগান দিতে শোনা যায়।
এদিকে, চলমান আন্দোলনকে ‘বিদেশি-প্রণোদিত’ নাশকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের চাপে সরকার কখনোই পিছু হটবে না। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতেই আন্দোলনের নামে এই অস্থির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে ইরান। চিঠিতে বিক্ষোভকে ‘সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও ব্যাপক ভাঙচুরে’ রূপ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান বর্তমানে ‘বড় সমস্যায়’ পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “তোমরা গুলি শুরু না করাই ভালো, কারণ আমরাও গুলি শুরু করব।” এর আগেও তিনি সতর্ক করে বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
তবে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে সীমিত রাখা হয়েছে এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি ও হতাহতের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

