মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিজেদের জরুরি মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে…
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট: উদ্বেগ কমাতে মজুদ তেল ছাড়ছে জাপান
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিজেদের জরুরি মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান সরকার।
সোমবার (১৬ মার্চ) প্রকাশিত সরকারি গেজেটে এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, জাপান সরকার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
গত সপ্তাহেই জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ঘোষণা করেছিলেন যে, নিরাপত্তা ও সরবরাহ সংকটের সম্ভাবনা বিবেচনায় সরকার একতরফাভাবে তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়বে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, কারণ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালির এই অচলাবস্থা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (International Energy Agency) বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। সংস্থাটি ঘোষণা করেছে যে, সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতায় মোট ৪০০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সমন্বিত পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকট কিছুটা হলেও কমানো যায়।
গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের আশেপাশে ওঠানামা করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছেন এবং হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাঘাতের সম্ভাবনাই মূলত তেলের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ।
সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়ায় প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ৮৫ ডলার, যা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও রবিবার তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল, তবে সোমবার কিছুটা কমতির ইঙ্গিতও দেখা যায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যান্য দেশকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে জাপান সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হলেও তারা সেখানে নৌবাহিনী মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা করছে না। জাপানের দৃষ্টিতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে।
জাপান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগতভাবে তেল মজুদ রাখার নীতির কারণে তাদের কাছে এমন মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ২৫৪ দিন দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের এই সিদ্ধান্ত শুধু নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আতঙ্ক কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বড় অর্থনীতির দেশগুলো যখন বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে, তখন তা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা কমাতে সহায়তা করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কবে প্রশমিত হবে তা এখনো অনিশ্চিত। তবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশ যে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

